প্রবাসীদের উদ্বেগ সত্বেও টু শব্দ করেনি দিল্লি সউদীতে ২৫ বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
সউদী আরবে মাদক মামলায় এক ভারতীয় নাগরিকের ২৫ বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হলেও বিষয়টিতে কূটনৈতিকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করেছে দিল্লি। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাজা বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নের এই ঘটনাকে একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে দেখা গেছে প্রতিবেশীদের নিয়ে দাদাগিরিতে মত্ত মোদি সরকারকে।
দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সউদী আরবের দাম্মাম কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় কেরালার মাহের পেরিংগাদির বাসিন্দা আবৃত্তি ভাল্লিয়িরের (৪১)। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রথমে ২৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সউদী রিয়াল জরিমানা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সউদী রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের প্রেক্ষিতে বিচারিক আদালত সেই রায় পরিবর্তন করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ভারতীয় প্রবাসীর পরিবারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তোলা সত্বেও সউদী আরবের কঠোর সার্বভৌম আইন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে তাদের জিরো-টলারেন্স নীতি এবং ভারতের কৌশলগত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই এ বিষয়ে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ, রাষ্ট্রদূতকে কোনো তলব বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমানে একটি মোবাইল ফোনের দোকানে কর্মরত আবৃত্তি ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সউদী আরবে নতুন কাজের সন্ধানে ছিলেন। ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর, যেদিন তার দেশে ফেরার কথা ছিল, কান্নুরের ওই ব্যক্তি তাকে তার গাড়িটি সউদী আরবে নিয়ে গিয়ে সেখানে একজনের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। তাকে রিটার্ন টিকিটের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়। এদিকে তার পরিবার কালিকট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (কারিপুর) তার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার মোবাইল ফোনটি বাজেয়াপ্ত ও বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, ফলে তার কী হয়েছে তা পরিবারের জানা ছিল না। কয়েকদিন পর পরিবার তার গ্রেপ্তারের খবর জানতে পারে।
পরিবারের ভাষ্যমতে, কান্নুরের এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে সউদী-ওমান সীমান্ত দিয়ে একটি গাড়ি সউদী আরবে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে ভিসা ও যাতায়াতের টিকিটের লোভ দেখায়। ওই ব্যক্তি আবৃত্তিকে জানান যে গাড়ির দুটি ট্যাংকের মধ্যে একটি লিক আছে, তাই যেন সেখানে পেট্রোল না ভরা হয়। প্রকৃতপক্ষে, সেই ফুয়েল ট্যাংকের ভেতরেই ৪৩ কেজি মেথঅ্যামফিটামিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সীমান্ত পার হওয়ার সময় গাড়ি তল্লাশি করে মাদক উদ্ধার করা হয় এবং সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আবূত্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আবূত্তিই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। মৃত্যুকালে তিনি মা, স্ত্রী, দুই সন্তান ও তিন বোনকে রেখে গেছেন। তার বাবা আগেই মারা যান। অর্থসংকটের কারণে তার পরিবার সউদী আরবে উপযুক্ত আইনি সহায়তা নিতে পারেনি বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, আবৃত্তির বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, দুই সন্তান এবং তিন বোন তাকে বাঁচানোর জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। পরিবার সরকারের কাছে বারবার আবেদন জানিয়ে এসেছেন যে তিনি সম্পূর্ণ নিরপরাধ এবং তাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
পরিবারের অভিযোগ, যে ব্যক্তি আবৃত্তিকে গাড়িটি দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তিনি তাকে প্রতারিত করার কথা স্বীকার করেন এবং বিষয়টি মিটমাট করার জন্য টাকার প্রস্তাবও দেন, কিন্তু তার সত্বেও তার মুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দিল্লির কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে দায়ী করে এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় ভারতীয়দের।
পরিবার আরও অভিযোগ করে যে, আবৃত্তির মুক্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্য এক ব্যক্তি তাদের কাছ থেকে আড়াই লাখ (২.৫ লাখ) রুপি হাতিয়ে নিয়েছে।
দিল্লির নীরবতা: কেন কোনো ‘টু শব্দ’ করেনি ভারত?
এদিকে, আবূত্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর এবং এর আগে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো কূটনৈতিক প্রতিবাদ বা জোরালো হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরেও রিয়াদের বিরুদ্ধে দিল্লি কোনো আনুষ্ঠানিক আপত্তি বা কঠোর মন্তব্য করেনি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্বেগকে আমলে নিয়ে বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলোকেও।
প্রতিবেশীদের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সবসময় নাক গলানো ও শক্তিশালী কূটনীতির দাবি করা দিল্লির এই নীরবতার পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমত; সউদী আরবে তাজির আইনে মাদক পাচার বা চোরাচালানের মতো অপরাধের শাস্তি অত্যন্ত কঠোর (স্বয়ংক্রিয়ভাবে মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর বিচারিক রায়)। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সউদী সরকার সাধারণত অন্য কোনো দেশের কূটনৈতিক চাপে রায় শিথিল করে না। দ্বিতীয়ত; ভারত ও সউদী আরবের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত ঘনিষ্ট কৌশলগত, বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে তেল বাণিজ্য ও কোটি কোটি ভারতীয় প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষায় দিল্লি সাধারণত এমন সংবেদনশীল বিচারিক বিষয়গুলোতে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত থাকে। ফলে ভারত সরকার এ ধরনের মামলায় সাধারণত অভিযুক্তকে আইনি সহায়তা প্রদান ও কনস্যুলার অ্যাক্সেস নিশ্চিত করার মধ্যেই নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রেখেছে, একে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিবাদে রূপ দেয়নি।’










