শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চলমানশিরোনাম
বিজ্ঞাপনআপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন এখানে।
বাংলাদেশ

নিজ জেলায় বিধি লঙ্ঘন করে বহাল তবিয়তে ডাক্তার দম্পতি: ক্ষমতার বলয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ

নিজ জেলায় বিধি লঙ্ঘন করে বহাল তবিয়তে ডাক্তার দম্পতি: ক্ষমতার বলয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ
প্রিন্ট নিউজ

স্টাফ রিপোর্টার পিন্টু শেখ

স্বাস্থ্যখাতের নীতিমালা স্পষ্ট বলছে, কোনো সিভিল সার্জন নিজ জেলায় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। অথচ চুয়াডাঙ্গায় এই বিধান যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম উপেক্ষা করে চুয়াডাঙ্গা জেলার সিভিল সার্জন পদে বহাল রয়েছেন ডা. হাদী জিয়াউদ্দিন আহমেদ, যিনি একই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। তার স্ত্রী ডা. শারমিন আক্তারও কর্মরত রয়েছেন একই জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

ডা. হাদী জিয়াউদ্দিন আহমেদের চাকরিজীবনের শুরুটা আলমডাঙ্গা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে। এরপর মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ২০২৪ সালে ঝিনাইদহে সিভিল সার্জন হন এবং বছর না পেরোতেই বদলি হয়ে নিজ জেলায় একই পদে যোগ দেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, সিভিল সার্জনের পদে নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। অথচ কীভাবে এই বিধি লঙ্ঘন করে তিনি নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গায় বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, সাবেক সংসদ সদস্য সোলায়মান হক জোয়ার্দার ছেলুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ডা. হাদী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বিগত সরকার আমলেই প্রশাসনিক পদ অলংকৃত করেছেন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নিজেকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয়দের দাবি, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি বারবার পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হন। স্বাস্থ্য বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, "তার নিয়োগ-স্থায়িত্ব সবই এক নির্দিষ্ট বলয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকায় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।"

সরকারি চিকিৎসক হয়েও ডা. হাদী জিয়াউদ্দিন আহমেদ পরিচালনা করছেন চুয়াডাঙ্গার আলোচিত "ডক্টরস কেয়ার অ্যান্ড স্পেশালিস্ট হাসপাতাল"। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত হাসপাতাল পরিচালনা করতে পারেন না, কিন্তু তার ক্ষেত্রে সেটি যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

২০২২ সালে যমুনা টেলিভিশনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, তিনি দালাল চক্রের মাধ্যমে রোগীদের সরকারি হাসপাতাল থেকে তার নিজস্ব ক্লিনিকে পাঠাতেন। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের মার্চে দ্যা নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নিজের ক্লিনিকের স্বার্থ রক্ষা করতেন। এ কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব মঞ্জুরুল হাফিজ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন।

ডা. শারমিন আক্তারও নিজ এলাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে বহাল রয়েছেন। অথচ সরকারি নীতিমালা অনুসারে, তিনি নিজ জেলার বাইরে দায়িত্ব পালন করার কথা। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক পদের সুযোগ নিয়ে তিনি রোগীদের ব্যক্তিগত চেম্বারে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চিকিৎসক দম্পতির বিপুল সম্পদ রয়েছে, যার মালিকানা কাগজে-কলমে অন্যদের নামে। আলমডাঙ্গায় ‘আয়েশা পার্ক’ নামে ছয়তলা বিশিষ্ট একটি ভবন রয়েছে, যেখানে ‘ডক্টরস কেয়ার’ হাসপাতাল পরিচালিত হয়। তবে দলিলপত্রে মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছে তার শাশুড়ি মালিহা আক্তার পলিকে।

একজন সিনিয়র স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, "বিধি মোতাবেক, সরকারি চিকিৎসকের নামে বেসরকারি হাসপাতাল থাকতে পারে না। অথচ চুয়াডাঙ্গায় এই নিয়ম মানা হচ্ছে না, বরং তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকেও রহস্যজনকভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়।"

স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ বলছে, "একই পরিবারের দুজন ডাক্তার একই জেলায়, এমনকি একই উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাটা প্রশ্নবিদ্ধ। এতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রভাবিত হচ্ছে। আমরা চাই, স্বাস্থ্য বিভাগের উচ্চপর্যায়ে এই অনিয়মের তদন্ত হোক।"

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক শেখ ছাইদুল হক বলেন, "সিভিল সার্জনের নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালনের বিধান নেই। তবে কিভাবে এই নিয়ম লঙ্ঘন করে তিনি সেখানে বহাল আছেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার।"

একই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইন শাখার কর্মকর্তা পরিমল বাবু বলেন, "এই ধরনের ঘটনা স্বাস্থ্যখাতে নৈতিকতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।"

এদিকে, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে জানানো হয়েছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন প্রতিটি সেক্টরে সংস্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, তখন স্বাস্থ্যখাতেও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা জরুরি। সিভিল সার্জনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নীতিমালা লঙ্ঘন করে দায়িত্ব পালন করলে সাধারণ মানুষ সঠিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

জনমনে প্রশ্ন, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যদি এক চিকিৎসক দম্পতি নিজ জেলার গুরুত্বপূর্ণ পদে টিকে থাকেন, তাহলে স্বাস্থ্যে শৃঙ্খলা কীভাবে নিশ্চিত হবে? অনিয়ম ও প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য থামাতে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন। নইলে স্বাস্থ্য বিভাগে দুর্নীতির শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত হবে।

বিজ্ঞাপনআপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন এখানে।
শেয়ার করুন

ফটোকার্ড

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

ডাউনলোড করুন
বিজ্ঞপ্তি
দেশের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দৈনিক দেশের আয়নার পক্ষ থেকে সকল দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আপনার আশপাশে ঘটে যাওয়া যেকোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, হত্যাকাণ্ড, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, মাদক ও জনদুর্ভোগের খবর আমাদের জানিয়ে সহযোগিতা করুন। দৈনিক দেশের আয়না সর্বদা আপনার পাশে। যোগাযোগ: ০১৭১১৩৪৯২৩৭