উখিয়ায় মিয়ানমারে পাচারের সময় ৭৭ বস্তা সার জব্দ
আনছারুল হক কুতুবী কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের উখিয়ায় দেখা দেওয়া তীব্র কৃত্রিম সার সংকটের মাঝেই সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ সার আটক করেছে স্থানীয় সচেতন জনতা, উপজেলা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘প্রত্যয়’। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে উখিয়ার সীমান্তসংলগ্ন পালংখালী ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে সর্বমোট ৭৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়। কৃষকরা যখন এক বস্তা সারের জন্য ডিলারের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন, তখন এভাবে সীমান্ত পার করে সার পাচারের ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার মাগরিবের নামাজের পর উখিয়ার পালংখালী বাজারে একটি যাত্রীবাহী টমটম (ইজিবাইক) সন্দেহজনকভাবে চলাচলের সময় তল্লাশি চালায় স্থানীয় বাসিন্দারা। সারগুলো পালংখালী বাজার থেকে সীমান্তসংলগ্ন বটতলী এলাকার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পাচারের বিষয়টি স্পষ্ট হলে সামাজিক সংগঠন ‘প্রত্যয়’-এর সাধারণ সম্পাদক আশেক ইলাহি রুবেলের নেতৃত্বে স্থানীয়রা টমটমসহ প্রাথমিক পর্যায়ে ২ বস্তা সার আটকে দেন। পরবর্তীতে বিজিবি ও কৃষি সংস্থাকে খবর দেওয়া হয়। পরে সার্বিক তল্লাশি ও অভিযান চালিয়ে রাত ১১টার দিকে আরও ৭৫ বস্তাসহ সর্বমোট ৭৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়।
প্রত্যয় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশেক ইলাহি রুবেল জানান, "গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা টমটমসহ সারগুলো আটক করি। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবি ও কৃষি অফিসকে জানানো হয় এবং পরবর্তীতে তাদের উপস্থিতিতে উদ্ধারকৃত সার প্রশাসনিক জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে।"
খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা কামনাশিস, আবু তাহের ও সহকারী ইমরান মাহমুদ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। জব্দকৃত সার পরবর্তীতে স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় উপজেলা সরকারি কোষাগারে স্থানান্তরিত করা হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশিস বলেন, "সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সারগুলো জব্দ করি এবং উপজেলা সদরে নিয়ে আসি। তবে স্থানীয় জনতার পরামর্শ ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে টমটম চালক ও যানটিকে তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।"
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, "কৃষি অফিসাররা বারবার অভিযান চালাচ্ছেন কিন্তু তারা তো নিরস্ত্র। অস্ত্রধারী বাহিনী সীমান্তে দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও তারা অদ্যাবধি কোনো সার জব্দ করতে পারল না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যথাসময়ে এগিয়ে না আসার সুযোগেই একটি কালোবাজারি চক্র এভাবে সার পাচার করছে। আমাদের কৃষকেরা সারের জন্য হাহাকার করছেন,গতকাল ৯টি ওয়ার্ডের জন্য মাত্র সাড়ে ৮ টন সার বরাদ্দ পাওয়ায় ডিলারদের কাছে গিয়ে কৃষকরা মাত্র ১০ কেজি করে সার পাচ্ছেন। এতে ডিলাররাও লাঞ্ছিত হচ্ছেন।"
তিনি আরও বলেন, "বাইরের জেলা ও উপজেলা থেকে সার সংগ্রহ করে কালোবাজারিরা মিয়ানমারে পাচার করছে, অথচ বদনাম হচ্ছে স্থানীয় ডিলারদের। আমি উপজেলা নির্বাহীকে অনুরোধ করব আটক করা সারগুলো যেন পালংখালীর কৃষকদের মাঝেই বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি এক সপ্তাহের মধ্যে ইউনিয়নের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টন সার বরাদ্দ না দিলে আমাদের কৃষি ও কৃষক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে প্রতিটি ডিলারের দোকানে একজন করে মেম্বার ও গ্রাম পুলিশ তদারকির দায়িত্বে বসানো হবে।"
এদিকে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে গত ৫-৬ দিন ধরে চরম সার সংকট চলায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকরা। ক্ষুব্ধ কৃষকদের অভিযোগ, রোপণ ও পরিচর্যার এই মৌসুমে জমিতে দেওয়ার মতো এক বস্তা সারও বাজারে মিলছে না। অথচ অসাধু পাচারকারী চক্রটি কৌশল বদলে ক্ষুদ্র যানবাহনে (ইজিবাইক/টমটম) করে সীমান্ত পার করে নিয়মিত মিয়ানমারে সার পাচার করে যাচ্ছে।
অবিলম্বে সীমান্তকেন্দ্রিক এই পাচার সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দিতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। অন্যথায় চলতি মৌসুমে সীমান্ত এলাকায় কৃষি উৎপাদন ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।









